রবিবার সকালে ট্রেডিং অ্যাপ খুললেন। গত সপ্তাহে যে স্টকটা দেখছিলেন, সেটা ৭% বেড়েছে। মঙ্গলবারে এসে দেখলেন ৪% পড়ে গেছে। কোনো খবর নেই, কোনো ঘোষণা নেই — শুধু সংখ্যা লাফাচ্ছে। আসলে কী হচ্ছে?
শেয়ারের দাম কেন ওঠানামা করে — এটা বোঝা বিনিয়োগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাঠ। আর উত্তরটা, মূলত, অনেকের ধারণার চেয়ে সহজ।
একমাত্র নিয়ম: সরবরাহ ও চাহিদা
DSE-তে প্রতিটি শেয়ারের দাম নির্ধারিত হয় একটিমাত্র জিনিস দিয়ে — যেকোনো মুহূর্তে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে ভারসাম্য।
- ক্রেতা বেশি, বিক্রেতা কম → দাম বাড়ে
- বিক্রেতা বেশি, ক্রেতা কম → দাম কমে
ব্যস। অন্য সব কারণ — আয়ের রিপোর্ট, সংবাদ, গুজব, বৈশ্বিক বাজার — শুধু তখনই গুরুত্বপূর্ণ যখন সেগুলো কতজন মানুষ কিনতে বা বিক্রি করতে চায় তা পরিবর্তন করে।
বাজারের মতোই ভাবুন। সবাই যদি আম কিনতে চায় আর আম কম থাকে, দাম বাড়ে। অনেক বিক্রেতা আসলো কিন্তু কেনার মানুষ নেই — দাম পড়ে। DSE ঠিক এভাবেই কাজ করে, শুধু “আম”-এর জায়গায় “শেয়ার”।
ক্রেতা তৈরি করে কী? বিক্রেতা তৈরি করে কী?
এবার আসল মজার জায়গায় আসা যাক। কোন জিনিস একজন মানুষকে একটা নির্দিষ্ট মুহূর্তে কিনতে বা বিক্রি করতে উদ্বুদ্ধ করে?
১. কোম্পানির আয় (Earnings)
এটা সবচেয়ে মৌলিক চালিকাশক্তি। যখন একটা কোম্পানি শক্তিশালী ত্রৈমাসিক আয় রিপোর্ট করে — ধরুন EPS ৳৩.৫০ থেকে বেড়ে ৳৫.২০ হলো — ক্রেতারা ঝাঁপিয়ে পড়েন কারণ কোম্পানি বেশি টাকা আয় করছে। স্টকটা বেশি মূল্যবান হয়ে যায়।
উল্টোটাও সমানভাবে সত্য। একটা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি যেটা শেয়ারপ্রতি ৳৮ আয় করছিল, হঠাৎ ৳৪ রিপোর্ট করলো — বিক্রেতারা ক্রেতাদের ছাড়িয়ে যাবে। দাম পড়বে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: শেয়ারের দাম শুধু আয় ভালো না খারাপ তার ওপর প্রতিক্রিয়া দেখায় না — প্রতিক্রিয়া দেখায় আয় প্রত্যাশার চেয়ে ভালো না খারাপ তার ওপর। একটা কোম্পানি লাভ করেও শেয়ারের দাম পড়তে পারে — যদি বাজার আরও বেশি লাভ আশা করে থাকে।
২. সংবাদ ও ঘোষণা
সংবাদ সরবরাহ ও চাহিদায় হঠাৎ পরিবর্তন আনে। DSE প্রেক্ষাপটে কিছু উদাহরণ:
- ডিভিডেন্ড ঘোষণা: একটা কোম্পানি ৩০% নগদ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করলো। ক্রেতারা ঢুকে পড়েন কারণ তারা ডিভিডেন্ড পেতে চান, দাম বেড়ে যায়।
- রাইটস ইস্যু: কোম্পানি ডিসকাউন্টে নতুন শেয়ার ঘোষণা করলো। বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডাররা রাইটসের জন্য ক্যাশ তুলতে বিক্রি করতে পারেন, বা নতুন ক্রেতা আসতে পারেন।
- নিয়ন্ত্রক পরিবর্তন: BSEC নতুন মার্জিন ঋণের নিয়ম ঘোষণা করলো। মার্জিনে কেনা স্টকগুলোতে বিক্রির চাপ পড়তে পারে।
- ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন: একজন সুনামধন্য CEO হঠাৎ পদত্যাগ করলেন। বাজার ভয়ে বিক্রির দিকে যেতে পারে।
সব সংবাদ সমান নয়। ডিভিডেন্ডের রেকর্ড ডেটের ঘোষণার প্রভাব অনুমানযোগ্য ও স্বল্পমেয়াদী। কারখানায় বিস্ফোরণের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী ও মৌলিক।
৩. সেক্টর ও বাজার মনোভাব
স্টক একা একা চলে না। যখন ব্যাংকিং সেক্টর চাপে থাকে — হয়তো ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের কারণে — সব ব্যাংক স্টক একসাথে পড়ে, এমনকি ভালোভাবে পরিচালিত ব্যাংকগুলোও। যখন DSEX ১০০ পয়েন্ট পড়ে, বেশিরভাগ স্টক তাদের নিজস্ব ফান্ডামেন্টাল নির্বিশেষে কমে যায়।
এটাই বাজার মনোভাবের কাজ। ভয় সংক্রামক। আশাবাদও তাই।
২০১০ সালের DSE বুল রানে, কোনো আয় নেই, কোনো সম্পদ নেই, কোনো ব্যবসায়িক মডেল নেই — এমন স্টকও আপার সার্কিটে যাচ্ছিল। মনোভাব বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। যখন সেটা ফিরে এলো, দাম ধসে পড়লো।
৪. সুদের হার ও অর্থনীতি
যখন ব্যাংকের আমানতের সুদের হার বেশি থাকে (ধরুন ৯-১০%), অনেক বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজারের অনিশ্চয়তার চেয়ে ফিক্সড ডিপোজিটের নিরাপত্তা পছন্দ করেন। টাকা বাজার থেকে বের হয়ে যায়। যখন সুদ কমে (ধরুন ৫-৬%), শেয়ারবাজার তুলনামূলকভাবে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে এবং টাকা ঢোকে।
এই কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন মুদ্রানীতি পরিবর্তন হয়, এটা পরোক্ষভাবে DSE-র প্রতিটি স্টককে প্রভাবিত করে।
৫. তারল্য ও ফ্রি ফ্লোট
কিছু DSE স্টকের পাবলিক ট্রেডিংয়ের জন্য খুব কম শেয়ার থাকে (কম ফ্রি ফ্লোট)। এ ধরনের স্টকে সামান্য ক্রয় আগ্রহ আসলেই দাম নাটকীয়ভাবে লাফিয়ে উঠতে পারে, কারণ পর্যাপ্ত শেয়ারই নেই।
উল্টোদিকে, বিশাল ফ্রি ফ্লোটের স্টক — যেমন কোটি কোটি শেয়ারের একটা বড় ব্যাংক — নড়াচড়া করানো অনেক কঠিন। দাম সরাতে বিপুল ক্রয় বা বিক্রয় চাপ লাগে।
এই কারণেই ছোট Z ক্যাটাগরির স্টক একদিনে ১০% নড়তে পারে, অথচ একটা ব্লু-চিপ স্টক সবে ১% নড়ে।
একটি বাস্তব উদাহরণ: দামের চলাচলের বিশ্লেষণ
একটা বাস্তবসম্মত দৃশ্যকল্প দেখা যাক:
কোম্পানি XYZ শেয়ারপ্রতি ৳৮৫ তে ট্রেড হচ্ছে। তারপর:
১. ত্রৈমাসিক শেষ: কোম্পানি EPS রিপোর্ট করলো ৳২.৮০, গত বছর ছিল ৳১.৯০। ক্রেতা আসলো। দাম গেল ৳৯২ তে। ২. ডিভিডেন্ড ঘোষণা: বোর্ড ২০% নগদ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করলো। আরও ক্রয়। দাম ৳৯৮ ছুঁলো। ৩. রেকর্ড ডেট পার হলো: ডিভিডেন্ড শিকারিরা বিক্রি করলো। দাম নামলো ৳৮৯ তে। ৪. সেক্টর রোটেশন: ব্যাংকিং সেক্টরে র্যালি শুরু হলো, XYZ-এর সেক্টর থেকে টাকা সরে গেল। দাম নামলো ৳৮৪ তে। ৫. বাজার সংশোধন: এক সপ্তাহে DSEX ৩% পড়লো। কোম্পানি-সংক্রান্ত কোনো খবর ছাড়াই XYZ নামলো ৳৭৮ তে।
লক্ষ্য করুন — কোম্পানি বদলায়নি। তাদের কারখানা চলছিল, কর্মীরা কাজ করছিল। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দাম ৳২০ দুই দিকেই নড়লো। এটাই বাজার — পরিবর্তনশীল চাহিদার ভিত্তিতে দাম নির্ধারণ ও পুনর্নির্ধারণ।
দামের ওঠানামা আপনাকে কী বলে না
এখানে একটা কথা যা অনেক DSE বিনিয়োগকারী মিস করেন: স্বল্পমেয়াদী দামের ওঠানামা একটা কোম্পানির প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে প্রায় কিছুই বলে না।
একটা স্টক এক মাসে ১৫% পড়তে পারে এবং তারপরও দারুণ ব্যবসা হতে পারে। একটা স্টক ৪০% বাড়তে পারে এবং তারপরও মৌলিকভাবে অতিমূল্যায়িত হতে পারে। দাম হলো আপনি কী দিচ্ছেন; মূল্য হলো আপনি কী পাচ্ছেন।
আপনি যদি দীর্ঘমেয়াদে — সপ্তাহ নয়, বছরের হিসেবে — বিনিয়োগ করেন, তাহলে দৈনিক দামের ওঠানামা নিছক শোরগোল। আসল প্রশ্ন হলো কোম্পানি তার আয় বাড়াচ্ছে কিনা, প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখছে কিনা, এবং শেয়ারহোল্ডারদের সাথে ভালো আচরণ করছে কিনা।
FinTrail কীভাবে সাহায্য করে
দাম কেন ওঠানামা করে তা বোঝা এক জিনিস। আপনার পুরো পোর্টফোলিও জুড়ে এটা ট্র্যাক করা আরেক জিনিস। FinTrail আপনাকে রিয়েল-টাইম দামের পরিবর্তন মনিটর করতে, নির্দিষ্ট থ্রেশহোল্ডের জন্য প্রাইস অ্যালার্ট সেট করতে, এবং প্রাইস চার্টের পাশাপাশি EPS ও P/E রেশিওর মতো মৌলিক তথ্য দেখতে দেয়। প্রতিটি টিকে প্রতিক্রিয়া দেখানোর বদলে আপনি আসলে যা গুরুত্বপূর্ণ তাতে মনোযোগ দিতে পারবেন।
ভেবে দেখুন
১. কোনো খবর ছাড়াই একটা স্টক ১০% পড়লে, সেটা কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেনার সুযোগ? সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আর কী জানতে চাইবেন?
২. দুটো স্টক একই ২০% EPS প্রবৃদ্ধি রিপোর্ট করলো। একটা ৮% বাড়লো, অন্যটা ৩% পড়লো। পার্থক্যটা কিসে হতে পারে?
৩. ব্যাপক বাজার পতনের সময়, আপনি কি শক্তিশালী ফান্ডামেন্টালের একটা স্টক ধরে রাখবেন যেটা ১৫% পড়েছে, নাকি আরও পতন এড়াতে বিক্রি করবেন? কোন বিষয়গুলো আপনার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে?


